ঠেকানো যাচ্ছে না তামাকের আগ্রাসন : পরিবেশ বিপর্যয়ের আশঙ্কা

মোঃ নাজমুল সাঈদ সোহেল
মাটি, পরিবেশ ও স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর তামাকের চাষাবাদ।তামাক চাষ নিরুৎসাহিতকরণে রাষ্ট্রীয়ভাবে কোন নীতিমালা নেই। এমনকি নীতামালা তৈরিরও কোন উদ্যোগ নেই। বিচ্ছিন্নভাবে তামাক চাষে ঋণ প্রদান বন্ধে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রজ্ঞাপন, ভর্তুকি মূল্যের সার ব্যবহার বন্ধে কৃষি মন্ত্রণালয়ের নিষেধাজ্ঞা এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কিছু ক্ষুদ্র প্রয়াসেই সীমাবদ্ধ তামাক চাষ নিরুৎসাহিতকরণ কার্যক্রম। কিন্তু দুর্বল তদারকি এবং বহুজাতিক তামাক কোম্পানিগুলোর ‘অদৃশ্য’ হস্তক্ষেপের কারণে এসব প্রচেষ্টা থেকে কোনো সুফল আসছে না। এতে প্রতিদিনই তামাক চাষ বেড়ে খাদ্য নিরাপত্তায় হুমকি সৃষ্টি করছে।
প্রতিবছর বেড়ে যাচ্ছে তামাক চাষের বিস্তার। স্থানীয় ট্যোবাকো কোম্পানী সমুহের লোভনীয় ফাঁদে পড়ে চাষীরা পরিবেশ বিধ্বংসী এ চাষে সম্পৃক্ত হচ্ছেন। বোরো মৌসুমের সবুজের ধানক্ষেত উচ্চ ফলনশীল তামাকের দখলে।এবারও কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার অন্তত সাতটি ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ জমিতে পরিবেশ বিধ্বংসী তামাকের ভয়াবহ আগ্রাসন ঘটেছে। ফসলি জমির পাশাপাশি উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় সংরক্ষিত বনভূমির খাসজমি ও মাতামুহুরী নতীর দুই তীরে তামাক চাষ হয়েছে। কয়েকবছর ধরে তামাক চাষের বিরুদ্ধে উপজেলা কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে মাঠপর্যায়ের চাষীদের নিরুৎসাহিত করতে সচেতনতামূলক নানা কার্যক্রম পরিচালনা এবং সরকারী প্রণোদনা দিয়েও কোন কাজে আসেনি।
সূত্রে জানা যায়, ১৯৮৪ সাল থেকে বৃটিশ আমেরিকা ট্যোবাকো, জাপান ট্যোবাকো, আকিজ ট্যোবাকো, ঢাকা ট্যোবাকো, আবুল খায়ের ও আলফা ট্যোবাকোসহ বেশ কয়েকটি কোম্পানী দীর্ঘদিন যাবৎ অত্র জনপদে তামাক চাষ ও বিস্তারে চাষীদের উদ্বুদ্ধ করছে।
এসব কোম্পানি চাষিদের তামাক পোড়ানোর সরঞ্জাম সরবরাহ এবং দাদন হিসেবে অগ্রিম টাকা দেয়ার প্রলোভনে ফেলে পরিবেশ বিধ্বংসী তামাক চাষে নামিয়েছে। কৃষি জমিতে তামাক আবাদের ফলে চলতি মৌসুমে বোরোর আবাদ ও রবিশস্য উৎপাদনে ব্যাপক বিপর্যয়ের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
তামাক চাষের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন জোরদারে নিয়োজিত স্থানীয় সচেতন মহল বলেন, প্রতিবছর চকরিয়া উপজেলার বিস্তীর্ণ জমিতে পরিবেশ বিধ্বংসী তামাক চাষ বেড়ে চলছে। ফসলি জমিতে তামাক চাষের কারণে আবাদি জমির পরিমাণ কমতে থাকায় এখন চরম হুমকির মুখে পড়েছে কৃষি উৎপাদন। তিনি অভিযোগ করে বলেন, এই অবস্থা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে খাদ্য উদ্বৃত্ত প্রতিটি জনপদে একসময় চরম খাদ্য ঘাটতির আশঙ্কা দেখা দেবে। এ জন্য তামাক চাষ বন্ধে প্রশাসনকে এখনই কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। সরেজমিন দেখা গেছে, সরকারি নির্দেশনা উপেক্ষা করে চকরিয়া উপজেলার বমুবিলছড়ি, সুরাজপুর-মানিকপুর, এবং কাকারা,  কৈয়ারবিল, বরইতলী, লক্ষ্যারচর, ফাঁসিয়াখালী ও কৈয়ারবিল ইউনিয়নে ফসলি জমির পাশাপাশি বমু বিলছড়ি, সুরাজপুর-মানিকপুর, কাকারা ইউনিয়নে বনবিভাগের বিপুল জমি ও মাতামুহুরী নদী তীরে জেগেউঠা চরের জমিতে তামাক চাষ হয়েছে।
 চকরিয়া পরিবেশ সাংবাদিক ফোরামের সভাপতি এমআর মাহমুদ বলেন, তামাক চাষ অধ্যুষিত বনাঞ্চলের আশপাশে ও লোকালয়ে শতশত তামাক চুল্লীতে তামাক পোড়ানো হয়।কয়েক বছর ধরে কাঠ পাচারকারীচক্র তামাক পোড়ানোর জন্য বনবিভাগের বিভিন্ন বনাঞ্চল থেকে নির্বিচারে বনজ সম্পদ উজাড় করে চলছে। এ অবস্থার কারণে সংরক্ষিত বনাঞ্চলের পাহাড় এখন ন্যাড়া পাহাড়ে পরিণত হচ্ছে।নাগরিক সচেতনায় প্রশাসনিক এত আয়োজনের পরও উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে ফসলি জমির পাশাপাশি সংরিক্ষত বনাঞ্চল এবং মাতামুহুরী নদীর তীরে তামাকের আগ্রাসন চলছে।তামাকের আগ্রাসনের কারণে এলাকার অনেক গাছগাছালি ইতিমধ্যে উজাড় হয়ে গেছে। এখন নদীপথে উজানের পাহাড়ি এলাকা থেকে কাঠ আনা হয়।
সুরাজপুর-মানিকপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আজিমুল হক আজিম বলেন, ‘তামাক চাষ কোনভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। চাষিরা বেশিভাগ গরীব।  তামাক কোম্পানির দাদনদের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে কৃষকরা, এতে তারা তামাক চাষ করে লাভবানও হচ্ছে না। কৃষকদের সচেতনতা বৃদ্ধি করতে উপজেলা প্রশাসন,এনজিও, পরিবেশ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে তামাক চাষের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন আরো জোরদার করা উচিত বলে মনে করি।
এ ব্যাপারে এনজিও ইপসার প্রধান নির্বাহী আরিফুর রহমান বলেন, সব তামাকচাষিকে আমরা উদ্বুদ্ধ করব যাতে করে তারা তামাকের বিকল্প ফসলগুলো চাষ করে। এছাড়া আমাদের টার্গেট হচ্ছে ২০৪০ সালের মধ্যে তামাকমুক্ত বাংলাদেশ গড়া। তবে আইন অমান্য করে চকরিয়ার মাতামুহুরী নদীর তীর ঘেঁষে এখনো চলছে তামাক চাষ। সংশ্লিষ্ট দফতরগুলোতে তামাকচাষিদের পরিসংখ্যান নিয়ে রয়েছে বেশ লুকোচুরি। থামছে না তামাকের আগ্রাসন। চাষিরা আটকে যাচ্ছেন তামাক কোম্পানিগুলোর বিপণন কৌশল ও নগদ প্রলোভনে।
চকরিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা এস.এম. নাসিম হোসেন বলেন, ‘তামাক চাষের কুফল সম্পর্কে ইতোমধ্যে বিভিন্ন এলাকায় মাঠ বৈঠকের কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে। এতে এই বছর অন্য বছরের তুলনায় ১০৫ হেক্টর জমিতে তামাক চাষ হয়নি। তারা এসব জমিতে সবজি, সরিষা ও ফুল চাষ করেছে।’তিনি আরো বলেন, ‘সরকারীভাবে তামাক চাষ বন্ধে এইপর্যন্ত কোনধরণের দিক-নির্দেশনা নেই। এর পরেও তামাকের ভয়াবহতা অনুভব করে আমরা চেষ্টা করেছি নানা কর্মসূচী পালনের মাধ্যমে তামাক চাষীদের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে। এক্ষেত্রে তামাক চাষীদেরই বেশি সচেতন হতে হবে। মুলত চাষীরা সচেতন হলে বিকল্প চাষের প্রতি আগ্রহ বাড়বে। অন্যথায় আবাদি জমি কমে গেলে ফসল উৎপাদন তথা নিরাপদ খাদ্য ভান্ডার নিশ্চিতে বড়ধরণের বিপর্যয় দেখা দেবে।
স্থানীয় পরিবেশ সচেতন মহল মনে করছেন, জরুরি ভিত্তিতে সাঁড়াশি অভিযান চালিয়ে মাতামুহুরী নদীর দুই তীর, সংরক্ষিত বনাঞ্চলসহ বিভিন্ন জায়গায়  রোপিত তামাক ধ্বংস না করলে পরিবেশ বিপর্যয় ঠেকানো যাবে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published.